দেশের চলমান জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে জ্বালানি খাতকে মুনাফাভিত্তিক নয়, বরং জনসেবামূলক খাত হিসেবে পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম।
শনিবার (৯ মে ২০২৬) জাতীয় প্রেস ক্লাবে সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (সিআইপিজি) আয়োজিত “জ্বালানি সংকটের কারণ, প্রভাব ও সমাধান” শীর্ষক সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে তিনি এ আহ্বান জানান।
অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, বিগত সরকারের সময়ে বিশেষ আইন এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইনের সংশোধনের মাধ্যমে জ্বালানি খাতে অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। ফলে রাষ্ট্রীয়ভাবে সেবামূলক খাত হিসেবে পরিচালিত জ্বালানি ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক কাঠামোয় রূপান্তরিত হয়ে দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেশি ব্যয় করলেও কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কাঠামোগত সংস্কার ও বিকল্প জ্বালানি উৎসে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
জনবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট প্রণয়নের আহ্বান সিআইপিজির প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায়
সেমিনারে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, দেশের মাত্র ১ শতাংশ কৃষিজমি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের আওতায় আনা গেলে বছরে প্রায় ৫০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমাতে সক্ষম হবে।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় হওয়া বিপুল ভর্তুকি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করা হলে বিকল্প শক্তির প্রসার ঘটবে এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
‘বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বদলে সংস্কার ও অপচয় রোধ জরুরি’
সেমিনারে অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা জ্বালানি খাত সংস্কারের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে—জ্বালানি খাতকে পুনরায় সেবাখাত হিসেবে ঘোষণা, অযৌক্তিক ব্যয় ও অতিরিক্ত মুনাফা হ্রাস, ভর্তুকির পুনর্বিন্যাস, বিইআরসিকে শক্তিশালী করা, জ্বালানি খাতে দুর্নীতির দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, মন্ত্রণালয়কে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ থেকে পৃথক করা, বাপেক্সকে শক্তিশালী করা এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, দেশের জ্বালানি সংকট এখন শুধু বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি শিল্প, কৃষি, পরিবহন এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে বাজারে চাহিদা কম থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান মূল্য সমন্বয় করতে পারছে না। ফলে শিল্পখাতে মুনাফা কমে যাচ্ছে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম চাপে পড়ছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সংকট সমাধানের পথ দেখালেন বিশেষজ্ঞ
সেমিনারে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. আবদুল মোমেনসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
সিআইপিজি মনে করে, টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি খাতের সামগ্রিক সংস্কার এখন সময়ের দাবি।